মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরায়েলকে ঢালাওভাবে সামরিক সহায়তা প্রদান এবং ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য কোনো যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি জড়িয়ে পড়ার নীতিকে দেশটির সাধারণ মানুষ আর সহজভাবে নিচ্ছেন না। মার্কিন প্রশাসনের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের প্রতি সাধারণ নাগরিকদের সমর্থন দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে কমছে বলে নতুন এক চাঞ্চল্যকর জনমত জরিপে উঠে এসেছে। আমেরিকার প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে দেশজুড়ে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক বিশেষ সমীক্ষায় মার্কিন জনমতের এই নাটকীয় ও অভূতপূর্ব পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে মার্কিন নাগরিকদের এই মানসিকতার পরিবর্তনের খবরটি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
নতুন এই যৌথ জরিপে দেখা গেছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের সরাসরি সামরিক অভিযান বা যুদ্ধ ঘোষণার প্রস্তাবকে সাধারণ নিবন্ধিত ভোটারদের একটি বিশাল অংশ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। জরিপে অংশ নেওয়া উত্তরদাতাদের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মার্কিন যুদ্ধকে সমর্থন জানিয়েছেন। এর বিপরীতে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৬৪ শতাংশ ভোটার এই ধরনের রক্তক্ষয়ী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। দেশের বাইরে নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের পেছনে মার্কিন অর্থ ও সৈন্য ঢালার বিষয়ে সাধারণ মানুষের মনে যে গভীর অনীহা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, এই পরিসংখ্যান তারই স্পষ্ট প্রমাণ দিচ্ছে।
সমীক্ষাটি পরিচালনার জন্য ১ হাজার ৫০৭ জন নিবন্ধিত ভোটারের কাছ থেকে সরাসরি মতামত সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের আরেক জ্বলন্ত ইস্যু অর্থাৎ ইসরায়েলকে আমেরিকার পক্ষ থেকে দেওয়া নিয়মিত সামরিক ও অস্ত্র সহায়তা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, মার্কিন সরকারের এই নীতির প্রতিও দেশের মানুষের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৫৭ শতাংশ উত্তরদাতা ইসরায়েলকে বিপুল পরিমাণ মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্তের সরাসরি বিরোধিতা করেছেন। অন্যদিকে, মাত্র ৩৭ শতাংশ মানুষ এখনো এই বিতর্কিত সামরিক সহায়তার পক্ষে নিজেদের মত বজায় রেখেছেন। অর্থাৎ, ইসরায়েলের যুদ্ধনীতিতে মার্কিন করদাতাদের অর্থের অপচয় নিয়ে খোদ আমেরিকার ভেতরেই এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
জনমতের এই বিশাল পরিবর্তনটি আরও ভালোভাবে বোঝা যায় যদি এর আগের কিছু পরিসংখ্যানের দিকে নজর দেওয়া যায়। তুলনামূলক বিশ্লেষণের জন্য ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসের একটি হিসাব সামনে আনা যেতে পারে। গাজায় ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার ঠিক এক মাস পর, কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে একটি অনুরুপ জনমত জরিপ চালানো হয়েছিল। সেই সময়ে দেখা গিয়েছিল যে, অর্ধেকেরও বেশি অর্থাৎ প্রায় ৫১ শতাংশ মার্কিন ভোটার ইসরায়েলে অতিরিক্ত সামরিক ও অস্ত্র সহায়তা পাঠানোর সিদ্ধান্তের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এবং গাজায় ক্রমাগত বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও মানবিক সংকটের কারণে মার্কিন জনগণের সেই মনোভাব এখন পুরোপুরি উল্টে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই জরিপের সার্বিক ফলাফল থেকে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অযাচিত সামরিক সম্পৃক্ততা এবং ইসরায়েলকে অন্ধভাবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সহায়তা দেওয়ার ঐতিহাসিক নীতির বিরুদ্ধে মার্কিন জনমতের মধ্যে একটি বিশাল ও ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটছে। আমেরিকার সাধারণ মানুষ এখন বাইরের দেশের যুদ্ধবিগ্রহে জড়িয়ে পড়ার চেয়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষাকেই বেশি প্রাধান্য দিতে চাচ্ছেন। সাধারণ ভোটারদের এই স্পষ্ট বার্তা আগামী দিনে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের ওপর নিশ্চিতভাবেই এক ধরনের বড় মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে।
তথ্যের মূল উৎস: আল-জাজিরা

বুধবার, ২০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ মে ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরায়েলকে ঢালাওভাবে সামরিক সহায়তা প্রদান এবং ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য কোনো যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি জড়িয়ে পড়ার নীতিকে দেশটির সাধারণ মানুষ আর সহজভাবে নিচ্ছেন না। মার্কিন প্রশাসনের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের প্রতি সাধারণ নাগরিকদের সমর্থন দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে কমছে বলে নতুন এক চাঞ্চল্যকর জনমত জরিপে উঠে এসেছে। আমেরিকার প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে দেশজুড়ে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক বিশেষ সমীক্ষায় মার্কিন জনমতের এই নাটকীয় ও অভূতপূর্ব পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে মার্কিন নাগরিকদের এই মানসিকতার পরিবর্তনের খবরটি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
নতুন এই যৌথ জরিপে দেখা গেছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের সরাসরি সামরিক অভিযান বা যুদ্ধ ঘোষণার প্রস্তাবকে সাধারণ নিবন্ধিত ভোটারদের একটি বিশাল অংশ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। জরিপে অংশ নেওয়া উত্তরদাতাদের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মার্কিন যুদ্ধকে সমর্থন জানিয়েছেন। এর বিপরীতে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৬৪ শতাংশ ভোটার এই ধরনের রক্তক্ষয়ী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। দেশের বাইরে নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের পেছনে মার্কিন অর্থ ও সৈন্য ঢালার বিষয়ে সাধারণ মানুষের মনে যে গভীর অনীহা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, এই পরিসংখ্যান তারই স্পষ্ট প্রমাণ দিচ্ছে।
সমীক্ষাটি পরিচালনার জন্য ১ হাজার ৫০৭ জন নিবন্ধিত ভোটারের কাছ থেকে সরাসরি মতামত সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের আরেক জ্বলন্ত ইস্যু অর্থাৎ ইসরায়েলকে আমেরিকার পক্ষ থেকে দেওয়া নিয়মিত সামরিক ও অস্ত্র সহায়তা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, মার্কিন সরকারের এই নীতির প্রতিও দেশের মানুষের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৫৭ শতাংশ উত্তরদাতা ইসরায়েলকে বিপুল পরিমাণ মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্তের সরাসরি বিরোধিতা করেছেন। অন্যদিকে, মাত্র ৩৭ শতাংশ মানুষ এখনো এই বিতর্কিত সামরিক সহায়তার পক্ষে নিজেদের মত বজায় রেখেছেন। অর্থাৎ, ইসরায়েলের যুদ্ধনীতিতে মার্কিন করদাতাদের অর্থের অপচয় নিয়ে খোদ আমেরিকার ভেতরেই এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
জনমতের এই বিশাল পরিবর্তনটি আরও ভালোভাবে বোঝা যায় যদি এর আগের কিছু পরিসংখ্যানের দিকে নজর দেওয়া যায়। তুলনামূলক বিশ্লেষণের জন্য ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসের একটি হিসাব সামনে আনা যেতে পারে। গাজায় ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার ঠিক এক মাস পর, কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে একটি অনুরুপ জনমত জরিপ চালানো হয়েছিল। সেই সময়ে দেখা গিয়েছিল যে, অর্ধেকেরও বেশি অর্থাৎ প্রায় ৫১ শতাংশ মার্কিন ভোটার ইসরায়েলে অতিরিক্ত সামরিক ও অস্ত্র সহায়তা পাঠানোর সিদ্ধান্তের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এবং গাজায় ক্রমাগত বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও মানবিক সংকটের কারণে মার্কিন জনগণের সেই মনোভাব এখন পুরোপুরি উল্টে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই জরিপের সার্বিক ফলাফল থেকে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অযাচিত সামরিক সম্পৃক্ততা এবং ইসরায়েলকে অন্ধভাবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সহায়তা দেওয়ার ঐতিহাসিক নীতির বিরুদ্ধে মার্কিন জনমতের মধ্যে একটি বিশাল ও ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটছে। আমেরিকার সাধারণ মানুষ এখন বাইরের দেশের যুদ্ধবিগ্রহে জড়িয়ে পড়ার চেয়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষাকেই বেশি প্রাধান্য দিতে চাচ্ছেন। সাধারণ ভোটারদের এই স্পষ্ট বার্তা আগামী দিনে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের ওপর নিশ্চিতভাবেই এক ধরনের বড় মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে।
তথ্যের মূল উৎস: আল-জাজিরা

আপনার মতামত লিখুন