দিকপাল

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রুশ তেল আমদানি অব্যাহত রাখবে ভারত


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬ | ১০:২৮ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রুশ তেল আমদানি অব্যাহত রাখবে ভারত

বিশ্বজুড়ে চলমান তীব্র জ্বালানিসংকটের মধ্যে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। সমুদ্রে আটকে থাকা রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল খালাস ও ব্যবহারের জন্য নতুন করে আরও ৩০ দিনের জন্য এক অস্থায়ী ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ। ওয়াশিংটনের দাবি, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং অপরিশোধিত তেলের একচেটিয়া সুবিধা যেন কোনো নির্দিষ্ট দেশের হাতে চলে না যায়, তা নিশ্চিত করতেই এই কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে চীন যাতে সস্তায় রাশিয়ার এই বিপুল পরিমাণ তেল একাই কিনে নিজের দেশে মজুদ করতে না পারে, সেই পথ বন্ধ করাই আমেরিকার মূল লক্ষ্য। তবে মার্কিন প্রশাসনের এই বড় ঘোষণার পরপরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, আমেরিকার এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া বা তুলে নেওয়ার ওপর ভারতের জ্বালানি নীতি মোটেও নির্ভরশীল নয়। নিজেদের দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করতে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বরাবরের মতোই অব্যাহত রাখবে।

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের এই আবহে গত সপ্তাহে রাশিয়ার তেলের ওপর আমেরিকার দেওয়া আগের বিশেষ ছাড়ের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সোমবার মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ নতুন করে এই ৩০ দিনের সাধারণ লাইসেন্স বা বিশেষ ছাড়পত্র জারি করতে বাধ্য হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এই সিদ্ধান্তের নেপথ্য কারণ স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং তীব্র জ্বালানি সংকটে ভুগতে থাকা দেশগুলোর কাছে যেন জরুরি ভিত্তিতে তেল পৌঁছানো নিশ্চিত করা যায়, সেই মানবিক ও অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করেই এই ৩০ দিনের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের কৃত্রিম সংকট কমবে এবং মূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করে দাম সাধারণের নাগালের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে।

মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি তার বিবৃতিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক চালের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এই সাময়িক ছাড়ের ফলে এশিয়ার পরাশক্তি চীন একচ্ছত্রভাবে কম দামে রাশিয়ার সমস্ত তেল কিনে নিজেদের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাবে না। বরং এর ফলে বিশ্বের অন্যান্য অভাবী ও উন্নয়নশীল দেশগুলোও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে এই তেল নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহারের সুবর্ণ সুযোগ পাবে। তবে আমেরিকার এই হিসাব-নিকাশ ও বৈশ্বিক মাতব্বরিকে পাত্তাই দেয়নি দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ অর্থনৈতিক শক্তি ভারত। মার্কিন এই ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় মঙ্গলবার সকালেই ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর ও পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়।

ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সুজাতা শর্মা সংবাদমাধ্যমকে সরাসরি জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশেষ ছাড় দেওয়ার আগেও ভারত নিজের প্রয়োজনে রাশিয়ার কাছ থেকে নিয়মিত তেল আমদানি করেছে, ছাড়ের মেয়াদ চলাকালেও কিনেছে এবং ভবিষ্যতেও নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী একইভাবে কিনবে। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ কোনো সিদ্ধান্ত বা নিষেধাজ্ঞার কড়াকড়ির কারণে ভারতের তেল আমদানির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। নয়াদিল্লির এই অনড় ও স্বাধীন অবস্থান স্পষ্ট করে দেয় যে, পশ্চিমা দেশগুলোর চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত মেনে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন করতে তারা মোটেও রাজি নয়।

বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইউক্রেন পরিস্থিতির পর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল থাকার পূর্ণ সুযোগ নিয়েছে ভারত। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটি রাশিয়া থেকে রেকর্ড পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে, যা গত কয়েক বছরের সমস্ত পরিসংখ্যানকে ছাড়িয়ে এক অভূতপূর্ব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাশিয়া থেকে সস্তায় পাওয়া এই বিপুল পরিমাণ তেল ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং সাধারণ মানুষের দৈনিক জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এক বিশাল ও যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে। ফলে ওয়াশিংটনের নতুন এই ৩০ দিনের ছাড়ের মেয়াদ শেষ হলেও ভারত যে তাদের এই লাভজনক বাণিজ্যিক অবস্থান থেকে এক চুলও নড়বে না, তা পুরোপুরি নিশ্চিত।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বুধবার, ২০ মে ২০২৬


মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রুশ তেল আমদানি অব্যাহত রাখবে ভারত

প্রকাশের তারিখ : ১৯ মে ২০২৬

featured Image

বিশ্বজুড়ে চলমান তীব্র জ্বালানিসংকটের মধ্যে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। সমুদ্রে আটকে থাকা রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল খালাস ও ব্যবহারের জন্য নতুন করে আরও ৩০ দিনের জন্য এক অস্থায়ী ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ। ওয়াশিংটনের দাবি, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং অপরিশোধিত তেলের একচেটিয়া সুবিধা যেন কোনো নির্দিষ্ট দেশের হাতে চলে না যায়, তা নিশ্চিত করতেই এই কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে চীন যাতে সস্তায় রাশিয়ার এই বিপুল পরিমাণ তেল একাই কিনে নিজের দেশে মজুদ করতে না পারে, সেই পথ বন্ধ করাই আমেরিকার মূল লক্ষ্য। তবে মার্কিন প্রশাসনের এই বড় ঘোষণার পরপরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, আমেরিকার এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া বা তুলে নেওয়ার ওপর ভারতের জ্বালানি নীতি মোটেও নির্ভরশীল নয়। নিজেদের দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করতে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বরাবরের মতোই অব্যাহত রাখবে।

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের এই আবহে গত সপ্তাহে রাশিয়ার তেলের ওপর আমেরিকার দেওয়া আগের বিশেষ ছাড়ের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সোমবার মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ নতুন করে এই ৩০ দিনের সাধারণ লাইসেন্স বা বিশেষ ছাড়পত্র জারি করতে বাধ্য হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এই সিদ্ধান্তের নেপথ্য কারণ স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং তীব্র জ্বালানি সংকটে ভুগতে থাকা দেশগুলোর কাছে যেন জরুরি ভিত্তিতে তেল পৌঁছানো নিশ্চিত করা যায়, সেই মানবিক ও অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করেই এই ৩০ দিনের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের কৃত্রিম সংকট কমবে এবং মূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করে দাম সাধারণের নাগালের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে।

মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি তার বিবৃতিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক চালের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এই সাময়িক ছাড়ের ফলে এশিয়ার পরাশক্তি চীন একচ্ছত্রভাবে কম দামে রাশিয়ার সমস্ত তেল কিনে নিজেদের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাবে না। বরং এর ফলে বিশ্বের অন্যান্য অভাবী ও উন্নয়নশীল দেশগুলোও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে এই তেল নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহারের সুবর্ণ সুযোগ পাবে। তবে আমেরিকার এই হিসাব-নিকাশ ও বৈশ্বিক মাতব্বরিকে পাত্তাই দেয়নি দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ অর্থনৈতিক শক্তি ভারত। মার্কিন এই ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় মঙ্গলবার সকালেই ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর ও পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়।

ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সুজাতা শর্মা সংবাদমাধ্যমকে সরাসরি জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশেষ ছাড় দেওয়ার আগেও ভারত নিজের প্রয়োজনে রাশিয়ার কাছ থেকে নিয়মিত তেল আমদানি করেছে, ছাড়ের মেয়াদ চলাকালেও কিনেছে এবং ভবিষ্যতেও নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী একইভাবে কিনবে। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ কোনো সিদ্ধান্ত বা নিষেধাজ্ঞার কড়াকড়ির কারণে ভারতের তেল আমদানির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। নয়াদিল্লির এই অনড় ও স্বাধীন অবস্থান স্পষ্ট করে দেয় যে, পশ্চিমা দেশগুলোর চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত মেনে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন করতে তারা মোটেও রাজি নয়।

বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইউক্রেন পরিস্থিতির পর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল থাকার পূর্ণ সুযোগ নিয়েছে ভারত। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটি রাশিয়া থেকে রেকর্ড পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে, যা গত কয়েক বছরের সমস্ত পরিসংখ্যানকে ছাড়িয়ে এক অভূতপূর্ব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাশিয়া থেকে সস্তায় পাওয়া এই বিপুল পরিমাণ তেল ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং সাধারণ মানুষের দৈনিক জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এক বিশাল ও যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে। ফলে ওয়াশিংটনের নতুন এই ৩০ দিনের ছাড়ের মেয়াদ শেষ হলেও ভারত যে তাদের এই লাভজনক বাণিজ্যিক অবস্থান থেকে এক চুলও নড়বে না, তা পুরোপুরি নিশ্চিত।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল