দিকপাল

২০ কোটি টাকার বরাদ্দ, কুরবানির চামড়া রক্ষায় মাঠে কঠোর নজরদারি!


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬ | ০৯:৩৭ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

২০ কোটি টাকার বরাদ্দ, কুরবানির চামড়া রক্ষায় মাঠে কঠোর নজরদারি!

দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী শিল্প খাত চামড়াশিল্পকে ঘিরে এবার আগেভাগেই কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। কুরবানির পশুর কাঁচা চামড়াকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং সীমান্তপথে পাচার ঠেকাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে বড় পরিসরের কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ইতোমধ্যে এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে অর্থ বিভাগ থেকে ২০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতের মতো অব্যবস্থাপনা কিংবা অবহেলায় যাতে একটি চামড়াও নষ্ট না হয়, সেদিকে এবার বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির কুরবানির চামড়া ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হিসেবে চামড়াশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে কাঁচা চামড়ার সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। সে কারণে জেলা প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে কুরবানির মৌসুমে চামড়ার দাম ধস, সংরক্ষণের অভাব এবং অব্যবস্থাপনার কারণে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়েছে। এতে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ মানুষ ও এতিমখানা-মাদ্রাসাগুলো, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের চামড়ার সুনাম কমেছে। এবার সেই পরিস্থিতি বদলাতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বিনামূল্যে লবণ বিতরণ, মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ, বাজার মনিটরিং, প্রচারণা এবং পাচার রোধে বিশেষ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অতীতে অনেক সময় কাঁচা চামড়া পানির দরে বিক্রি হয়েছে কিংবা সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। অথচ চামড়াশিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। তিনি বলেন, এবার সরকার চাইছে স্থানীয় পর্যায়েই চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ হোক। এজন্য কসাই, মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রতিনিধিদের বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি মো. শাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে মানসম্মত চামড়ার বিকল্প নেই। তিনি জানান, পশু জবাইয়ের তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে পর্যাপ্ত লবণ ব্যবহার করে চামড়া সংরক্ষণ না করলে দ্রুত পচন ধরে এবং গুণগত মান নষ্ট হয়। এর ফলে ট্যানারিগুলোও কাঙ্ক্ষিত মূল্য দিতে পারে না। তিনি আরও বলেন, ট্যানারিগুলো কুরবানির মৌসুমে চামড়া প্রক্রিয়াজাতের জন্য প্রস্তুত থাকলেও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার ও পানির ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না।

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এবার স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র সংগ্রহকারী, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনামূল্যে লবণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি চামড়া সংরক্ষণ ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। কুরবানির পরপরই সীমান্তবর্তী এলাকায় চামড়াবাহী ট্রাক চলাচলে কঠোর নজরদারি আরোপ করা হতে পারে, যাতে কোনোভাবেই পাচার না ঘটে।

এছাড়া সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবায়নে নিয়মিত বাজার তদারকি করা হবে। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ এবং ধর্মীয় সমাবেশে সচেতনতামূলক প্রচারণাও চালানো হবে। কোনো সিন্ডিকেট যাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কৃত্রিমভাবে দাম কমাতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখবে প্রশাসন।

২০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের অর্থ মূলত লবণ কেনা ও বিতরণে ভর্তুকি, মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণ, প্রচারণা কার্যক্রম, পরিবহণ সহায়তা এবং অস্থায়ী সংরক্ষণাগার ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করা হবে। একই সঙ্গে চামড়া সংগ্রহ ও পরিবহণে যুক্ত যানবাহনের ওপরও বিশেষ মনিটরিং থাকবে।

বাংলাদেশে কুরবানির চামড়ার বড় একটি অংশ এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিং ও মাদ্রাসাগুলোর মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। তবে সংরক্ষণ বিষয়ে অভিজ্ঞতার অভাবে প্রতিবছর এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। এবার সরকার সরাসরি এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পের আওতায় এনেছে। এতে তারা ভালোভাবে চামড়া সংরক্ষণ করতে পারবে এবং ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে চামড়াশিল্প ঘিরে এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশেষ করে পরিবহণ ব্যবস্থা, ট্যানারি মালিকদের বকেয়া পরিশোধ এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এবার ট্যানারি মালিকদের ওপরও কঠোর নজরদারি থাকবে, যাতে তারা সময়মতো চামড়া ক্রয় ও মূল্য পরিশোধ করে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বুধবার, ১৩ মে ২০২৬


২০ কোটি টাকার বরাদ্দ, কুরবানির চামড়া রক্ষায় মাঠে কঠোর নজরদারি!

প্রকাশের তারিখ : ১২ মে ২০২৬

featured Image

দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী শিল্প খাত চামড়াশিল্পকে ঘিরে এবার আগেভাগেই কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। কুরবানির পশুর কাঁচা চামড়াকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং সীমান্তপথে পাচার ঠেকাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে বড় পরিসরের কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ইতোমধ্যে এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে অর্থ বিভাগ থেকে ২০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতের মতো অব্যবস্থাপনা কিংবা অবহেলায় যাতে একটি চামড়াও নষ্ট না হয়, সেদিকে এবার বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির কুরবানির চামড়া ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হিসেবে চামড়াশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে কাঁচা চামড়ার সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। সে কারণে জেলা প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে কুরবানির মৌসুমে চামড়ার দাম ধস, সংরক্ষণের অভাব এবং অব্যবস্থাপনার কারণে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়েছে। এতে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ মানুষ ও এতিমখানা-মাদ্রাসাগুলো, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের চামড়ার সুনাম কমেছে। এবার সেই পরিস্থিতি বদলাতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বিনামূল্যে লবণ বিতরণ, মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ, বাজার মনিটরিং, প্রচারণা এবং পাচার রোধে বিশেষ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অতীতে অনেক সময় কাঁচা চামড়া পানির দরে বিক্রি হয়েছে কিংবা সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। অথচ চামড়াশিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। তিনি বলেন, এবার সরকার চাইছে স্থানীয় পর্যায়েই চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ হোক। এজন্য কসাই, মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রতিনিধিদের বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি মো. শাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে মানসম্মত চামড়ার বিকল্প নেই। তিনি জানান, পশু জবাইয়ের তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে পর্যাপ্ত লবণ ব্যবহার করে চামড়া সংরক্ষণ না করলে দ্রুত পচন ধরে এবং গুণগত মান নষ্ট হয়। এর ফলে ট্যানারিগুলোও কাঙ্ক্ষিত মূল্য দিতে পারে না। তিনি আরও বলেন, ট্যানারিগুলো কুরবানির মৌসুমে চামড়া প্রক্রিয়াজাতের জন্য প্রস্তুত থাকলেও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার ও পানির ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না।

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এবার স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র সংগ্রহকারী, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনামূল্যে লবণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি চামড়া সংরক্ষণ ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। কুরবানির পরপরই সীমান্তবর্তী এলাকায় চামড়াবাহী ট্রাক চলাচলে কঠোর নজরদারি আরোপ করা হতে পারে, যাতে কোনোভাবেই পাচার না ঘটে।

এছাড়া সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবায়নে নিয়মিত বাজার তদারকি করা হবে। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ এবং ধর্মীয় সমাবেশে সচেতনতামূলক প্রচারণাও চালানো হবে। কোনো সিন্ডিকেট যাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কৃত্রিমভাবে দাম কমাতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখবে প্রশাসন।

২০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের অর্থ মূলত লবণ কেনা ও বিতরণে ভর্তুকি, মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণ, প্রচারণা কার্যক্রম, পরিবহণ সহায়তা এবং অস্থায়ী সংরক্ষণাগার ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করা হবে। একই সঙ্গে চামড়া সংগ্রহ ও পরিবহণে যুক্ত যানবাহনের ওপরও বিশেষ মনিটরিং থাকবে।

বাংলাদেশে কুরবানির চামড়ার বড় একটি অংশ এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিং ও মাদ্রাসাগুলোর মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। তবে সংরক্ষণ বিষয়ে অভিজ্ঞতার অভাবে প্রতিবছর এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। এবার সরকার সরাসরি এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পের আওতায় এনেছে। এতে তারা ভালোভাবে চামড়া সংরক্ষণ করতে পারবে এবং ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে চামড়াশিল্প ঘিরে এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশেষ করে পরিবহণ ব্যবস্থা, ট্যানারি মালিকদের বকেয়া পরিশোধ এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এবার ট্যানারি মালিকদের ওপরও কঠোর নজরদারি থাকবে, যাতে তারা সময়মতো চামড়া ক্রয় ও মূল্য পরিশোধ করে।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল